শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ধ্বংসের কারণ

জাফর আহমাদ
“কত জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি। তাদের ওপর আমার আযাব অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাতের বেলায় অথবা দিনের বেলা যখন তারা বিশ্রামরত ছিল। আর যখন আমার আযাব তাদের ওপর আপতিত হয়েছিল তখন তাদের মুখে এ ছাড়া আর কোন কথাই ছিল না যে, ‘সত্যিই আমরা জালেম ছিলাম’।”(সুরা আল আরাফ ৪-à§«) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেন: “পুর্ববর্তী ইব্রাহিমের জাতি এবং আদ, সামুদ ও নুহের জাতিসমূহ এবং মাদায়েনবাসী ও মুতাফিকাতধারীদের ইতিহাস কি তারা জানে না? তাদের কাছে নবীরা সুস্পষ্ট নির্দেশমালা নিয়ে এসেছিলো। আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল। পক্ষান্তরে ঈমানদার নারী-পুরুষেরা পরস্পরের মিত্র ও সহযোগী। তারা ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে।” (তাওবা : ৭০-à§­à§§)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির ইতিহাস বিশ্ববাসীর শিক্ষা গ্রহণের জন্য উপস্থাপন করেছেন। আল্লাহ বলেন: “তাদের প্রত্যেককে আমি দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যেককে ধ্বংস করে দিয়েছি। আর সেই জনপদের ওপর দিয়ে তো তারা যাতায়াত করেছে, যার ওপর নিকৃষ্টতম বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়েছিল। তারা কি তার অবস্থা দেখে থাকেনি? প্রকৃতপক্ষে এরা পরকালে ফিরে যেতে হবে তা চিন্তা করে না।” (সুরা ফুরকান : ৩৯-৪০) “জনপদের লোকেরা কি এখন এ ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার শাস্তি কখনো অকস্মাৎ রাত্রিকালে তাদের ওপর এসে পড়বে না, যখন তারা থাকবে নিদ্রামগ্ন? অথবা তারা নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে যে, আমার মযবুত হাত কখনো দিনের বেলায় তাদের ওপর এসে পড়বে না, যখন তারা খেলা-ধুলায় মত্ত থাকবে? এরা কি আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে নির্ভীক হয়ে গেছে? অথচ যেসব সমপ্রদায়ের ধ্বংস অবধারিত তারা ছাড়া আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে আর কেউ নির্ভীক হয় না।” (সুরা আরাফ : ৯৭-৯৯) “যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্যে আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহের দুয়ার খুলে দিতাম। কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে। কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিল তার জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি।” (সুরা আরাফ : ৯৬)
এ সকল জাতির ধ্বংসের মুল কারণ হিসাবে তাদের নবী ও রাসুলদের অস্বীকার, অসৌজন্যমুলক আচরণ ও হত্যা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন: “এদের পুর্বে নুহের কওম, আসহাবুর রাস, সামুদ,আদ, ফেরাউন, লুতের ভাই, আউকাবাসী এবং তুব্বা কওমের লোকেরাও অস্বীকার করেছিল। প্রত্যেকেই রসুলদের অস্বীকার করেছিল। এবং পরিণামে আমার শাস্তির প্রতিশ্রুতি তাদের জন্য কার্যকর হয়েছে।” (সুরা ক্বাফ : ১২-১৪) এ ছাড়া ধ্বংসের আরো বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। যখনই কোন জাতি আল্লাহর হেদায়াত হতে মুখ ফিরিয়ে তাগুতের নেতৃত্বে ঔদ্যত্যে প্রদর্শন করে এবং পৃথিবীকে মানুষের বাস অনোপযোগী করে তুলে এবং পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্ব দুঃসহ এক অভিশাপে পরিণত হয়, তখন আল্লাহর আযাব এসে তাদের নাপাক অস্তিত্ব থেকে দুনিয়াকে মুক্ত করে। নিম্নে আল-কুরআনে উল্লেখিত ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি সমুহের ধ্বংসের কারণ বর্ণনা দেয়া হলো:
আদ আল-কুরআনের সুরা আরাফ, হুদ, মুমিন ও আহক্বাফ, শুরা, আল আনকাবুত ও হা-মীম আস সেজদায় এ জাতির আলোচনা করা হয়েছে। হযরত হুদ (আ.) কে এ জাতির কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। আদ ছিল আরবের প্রাচীনতম জাতি। তাদের অতীত কালের প্রতাপ-প্রতিপত্তি ও গৌরব গাঁথা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছিল। তারপর দুনিয়ার বুক থেকে তাদের নাম নিশানা মুছে যাওয়াটাই প্রবাদের রূপ নিয়েছিল। কুরআনের বর্ণনা মতে এ জাতির আবাসস্থল ছিল ‘আহকাফ’ এলাকা। এ এলাকাটি হিজায, ইয়ামন ও ইয়ামামার মধ্যবর্তী ‘রাবয়ুল খালীর দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুসারে এদের আবাস ভূমি ওমান থেকে ইয়ামান পর্যন্ত বিস্তৃৃত ছিল। আল কুরআন থেকে তাদের ধ্বংসের কারণ জানা যায়। জুলুমই ছিল তাদের ধ্বংসের প্রধান কারণ।
এ ধরনের আরেকটি পরিচিত জাতির নাম সামুদ জাতি। আল-কুরআনের সুরা আরাফ, হুদ, হিজর ও নামল এ জাতির আলোচনা করা হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম আরবের যে এলাকাটি আজো ‘আল-হিজর’ নামে খ্যাত সেখানেই ছিল এদের আবাস। আজকের সেউদী আরবের অন্তর্গত মদীনা ও তাবুকের মাঝখানে হিজায রেলওয়ে স্টেশন রয়েছে, তার নাম মাদায়েনে সালেহ। এটিই ছিল সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় স্থান। সামুদ জাতি পাহাড় কেটে যে সব বিপুলায়তন ইমারাত তৈয়ার করেছিল এখনো হাজার হাজার একর এলাকা জুড়ে সেগুলো অবস্থান করছে। তাবুক যুদ্ধের সময় নবী (স:) যখন এ এলাকা অতিক্রম করেছিলেন তখন তিনি মুসলমানদের এ শিক্ষণীয় নিদর্শনগুলো দেখান এবং এবং এমন শিক্ষাদান করেন যাতে একজন বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির শিক্ষা গ্রহণ করা উচিৎ। তাদের ধ্বংসের কারণ ছিল, তারা দাম্ভিক ছিল এবং অন্যের ওপর জুলুম করেছিল। ফলে তারা ভূমিকম্পের দ্বারা পাকড়াও হলো। এভাবে আরেক পরিচিত ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি হলো, লুত জাতি। আল কুরআনের সুরা আরাফ ও সুরা ক্বাফ এ জাতির আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান যে এলাকাটিকে ট্রান্স জর্ডান বলা হয় সেখানেই ছিল এ জাতিটির বাস। ইরাক ও ফিলিস্থিনের মধ্যবর্তী স্থানে এ এলাকাটি অবস্থিত।
আল কুরআনে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর মধ্যে আরো যাদের নাম উল্লেখ রয়েছে, তারা হলো, আহলে মাদইয়ান, সাবা জাতি, তুব্বা জাতি, বনী ইসরাঈল জাতি, আসহাবে উখদুদ, আসহাবুল কারিয়্যাহ, আসহাবুস সাবত, আসহাবুল রাস ও আসহাবে ফিল উল্লেখযোগ্য। তাদের প্রত্যেকের ধ্বংসের কারণ ছিল আবাধ্যতা, সীমালংঘন, জঘন্যতম কাজে লিপ্ত হওয়াসহ মানুষকে জুলুম করা এবং নিজেদের ওপরও জুলুম করা। আল কুরআনে তাদের ইতিহাস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে পৃথিবীর মানুষেরা তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
লেখক : ব্যাংকার

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ